পাংগং লেক- অপরূপ সৌন্দর্য আর নিঃসঙ্গতার মিলন।
সেপ্টেম্বর ২০১৭
প্রথম ইন্ডিয়া ট্যুর যে আমার এত আকর্ষণীয় হবে আমি স্বপ্নেও ভাবি নাই এই জন্য ধন্যবাদ পাবার যোগ্য সাইফুদ্দিন সরদার ভাই। ইন্ডিয়াতে আমরা অনেক জায়গায় ঘুরেছি দলবদ্ধভাবে, মোট ২৭ জন ছিলাম – নানান বয়েসি মানুষ আমরা। আজ শুধু আমি প্যাংগং লেক নিয়ে লিখব যার অপরূপ সৌন্দর্্য আর নিঃসঙ্গতার মিলন আমাকে নতুন করে অনেক কিছু ভাবতে শিখিয়েছে। সেই ছোটবেলা বাবার হাত ধরে স্কুলের রাস্তা পার হতাম-বাবার দিকে তাকাতাম আর ভাবতাম, কবে আমি বাবার মতো হবো। প্যাংগং যাওয়ার চড়াই উৎরাই পথ পাড়ি দিয়ে যখন প্যাংগং পৌঁছলাম তখন মনে হলো আজ এখানে আসতে পেরেছি সেদিন বাবার হাত ধরে রাস্তা পাড় হওয়া শিখতে পারার জন্য। আমি বলতে পারি হলফ করে অনেকের টাকা পয়সা থাকতে পারে কিন্তু চাইলেই হুট করে চলে যেতে পারবেন না আপনি।
ইন্ডিয়ান ছবি থ্রী ইডিয়ট- ছবির শুটিং এর পর জায়গাটি ভ্রমণ পিপাসু মানুষের কাছে বেশি জনপ্রিয় হয়ে ঊঠেছে। তবে সেখানে যেতে হলে আপনাকে আগেই থেকেই ইনার লাইন পারমিট নিতে হবে।
লে(Leh) থেকে প্যাংগং লেক( Pangong Lake ) এই ১৬৫ কিলোমিটার রাস্তা কারাকোরাম- বাদামি পর্বতমালার মধ্যে দিয়ে চলে গেছে l ভোর হতেই আমাদের বাস ছুটে চলল প্রকৃত অর্থেই ভয়ংকর সুন্দর পথ ধরে। সেই পথের রূপের বর্ণনা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। দু পাশে মোটা বরফের দেয়ালের মধ্যেদিয়ে পথ করে চলেছে আমাদের দুইটি বাস সাতাশ জন ট্রাভেলার নিয়ে। শাপের মতো একেবেকে রাস্তা শুধু উপরের দিকে উঠেছে। নিচের দিকে তাকালে ভয় আমাদের গ্রাস করেছে কিন্তু অপরূপ সৌন্দর্্য আমাদের মুখের ভাষা কেড়ে নিয়েছে। আমরা যেন বোবা হয়ে গিয়েছি । কেহ কারো সাথে রা পর্যন্ত করছি না পাছে কোনো সুন্দর দৃশ্য দেখা থেকে বঞ্চিত হওয়ার ভয়ে। নীল সে কেমন নীল হতে পারে আর! দেখতে হলে যেতে হবে ১৪২৭০ ফিট উচ্চতায় নীলের মহিমায় আচ্ছন্ন প্যাংগং লেকে। পিছনে দেখা যাবে তিব্বতের স্নো-ক্যাপ মাউন্টেন। ত প্যাংগং হ্রদ( Pangong Lake ) হলো পৃথিবীর সবচেয়ে উচ্চতর লবনাক্ত জলের হ্রদ । পথে পড়ে শক্তি গ্রাম। গ্রামের সবুজ খেত, ধারাবাহিক রুক্ষতার মধ্যে চোখকে আরাম দেয়। প্যাংগং লেকের অবস্থান ভারত আর চীনের সীমান্তবর্তী এলাকায়। প্যাংগং লেকের বিস্তার ভারত ও চীনের ১৩৪ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে, যার ৪০ শতাংশ ভারতের আর বাকি ৬০ শতাংশ চীনের অন্তর্ভুক্ত। পুরো প্যাংগং লেক পাড়ি দিতে হলে আপনাকে ভারত ও চীনের প্রায় ৬০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হবে। যেটা সম্ভব নয় আদৌ। অনেকে মনে করে, প্যাংগং লেক ভারতের ইন্দাস নদীর কোনো অংশ হয়তো। কিন্তু না, এটি কোনো নদীর অংশ নয়, বরং পাহাড় ও ভূমি দিয়ে আবৃত একটি বেসিন বা জলাশয় মাত্র। হাজার হাজার রুক্ষ পাহাড় ও মরুভূমির মাঝে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৪ হাজার ফুট ওপরে বিধাতার এক বিশেষ আশীর্বাদ। লেকের সমুদ্রনীল পানি কাচের মতো স্বচ্ছ- ক্ষণে ক্ষণে আকাশের রঙয়ের সাথে মিল রেখে বদলায়। আর এত ঠান্ডা যে বলে বোঝানো যাবে না। লবনাক্ত এই লেকে কাকড়া ছাড়া অন্য কোনো মাছ থাকে না এখানে। জিভে এক ফোঁটা পানি ছুয়াতেই লবনের স্বাদ পেলাম। লেকের জলে পা ডোবালাম। উপরে উড়ছে হাজারো সী-গাল। সেই এক অপূর্ব অনুভূতি। ঠান্ডা ক্রমশ বাড়ছে । সন্ধ্যা হয়ে আসছে । আজ রাতটা আমরা লেকের কাছাকাছি তাবুতেই কাটিয়ে দিব।
তাই আমরা গাড়ীতে উঠে তাবুর দিকে রওনা হলাম। সন্ধ্যা পরেই লেকের অন্য চিত্র। উপরে নীল আকাশ আর লেকের জলের রং কালো। ঠান্ডায় আমরা একেকজন জমে যেতে লাগলাম আর সাথে মাথা ব্যাথা। সাইফুদ্দিন অনেক পীড়াপীড়ি করল কিছু খাওয়ার জন্য কিন্তু বাতাসের সো সো শব্দে কিছুটা স্নো ফলের কারণে তাবু থেকে বের হতে চাচ্ছিলাম না। তবুও কিছু খাওয়ার জন্য সপরিবারে বের হলাম। আদী ঠান্ডার কারণে আমার উপর খুব রেগে ছিল। আমরা শুধু স্যুপ খেলাম। ফিরে এলাম তাবুর দিকে । ওদিকে আমাদের সাথে কয়েকজন কাঠে আগুন জালিয়ে গোল হয়ে বসেছে। আদী কিছুক্ষণ তাদের সাথে গিয়ে বসল। হাওয়া তখন ধারালো হয়ে উঠেছে। তাপমাত্রা নেমে যাচ্ছে হু হু করে। আমার সাজেশন- পর্যাপ্ত গরম কাপড় নিয়ে যাবেন সেখানে। আমি তখন কৌতুহল বশে একজনকে প্রশ্ন করলাম- তাপমাত্রা কত? সে উত্তর দিলো ২ ডিগ্রী সেলসিয়াস। রাত আরো গভীর হতে লাগল। হাওয়ায় কাপতে লাগল তাঁবু। সেই রাতটা শীতের সাথে যুদ্ধ করে পাড় করে দিলাম। ভোর পাঁচটায় তাবুর বাইরে উকি দিতেই চমকে উঠলাম। সূর্য তখনও উঠেনি। আমি কিছু ছবি তুলে নিলাম। সুর্য উঠার সাথে সাথেই লেককে ঘিরে পাহারগুলো বাদামি রং ধারণ করল আর জলে শুরু হয়ে গেল পার্পেল রঙের খেলা । আমি পার্পেল বলছি এই কারণে এই রঙয়ে সব রঙ থাকে-তাই বলা। এই প্যাংগং লেক আমাকে প্রকৃতির প্রেমিক বানিয়েছে-তাই এখন বৈষয়িক সবকিছু তুচ্ছ লাগে। এখন শুধু স্বপ্ন বুনি প্রকৃতির দেখার-আমি সেই স্বপ্নের কথা বলছি যা কখনও টাকা-পয়সা, পারিবারিক বন্ধন, মায়ার বাঁধন বা যশখ্যাতি দিয়ে কেনা যায় না।
আমি আবারও যেতে চাই কিন্তু আমার মনে হয় যাওয়া ঠিক হবে না কারণ প্রকৃতি যে অনাবিল সৌন্দর্য মানুষ তা রক্ষা করতে পারে না তাদের বেখায়ালি মনের জন্যে তাই প্রকৃতি তার আসল সৌন্দর্য হারাতে বসেছে ।





Way cool! Some extremely valid points! I appreciate you writing this write-up plus the rest of the site is also very good. Lindsay Isador Edveh