হুট করে সিদ্ধান্ত নিয়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের তিনটা টিকেট কেটে ফেললাম নেপালে সপরিবারে ঘুরে আসার জন্য । আমি অবশ্য গ্রুপ ট্যুর করতে পছন্দ করি কিন্তু এই যাত্রায় সাথে কাউকে পেলাম না তাই একলা চলার নীতি নিয়ে এগিয়ে গেলাম সামনে এবং নিদিষ্ট দিনে ৫ ঘন্টা বিমান বাংলাদেশের ডিলে নোটিশ নিয়ে বসে বসে থাকতে থাকতে অবশেষে প্লেন উড়াল দিল নেপালের আকাশ পথের উদ্দেশ্যে।
নেপাল হিমালয় অধ্যুষিত একটি দক্ষিণ এশিয়ার দেশ যার সাথে উত্তর চীন এবং দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিমে ভারতের সীমান্ত রয়েছে। নেপাল সার্ক-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। এর শতকরা ৮০ ভাগ জনগণই হিন্দু ধর্মের অনুসারী। এখানে পৃ্থিবীর সর্ব্বোচ পর্বত শৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট অবস্থিত।
সন্ধ্যার কিছু সময়ের পরই আমরা নেপাল ত্রিভুবণ এয়ারপোর্টে নামলাম। তারপর ৫ মিনিটের মধ্যে অন-এরাইভাল ভিসা নিয়ে ইমিগ্রেশন পার হলাম। সার্কভুক্ত দেশ হওয়ার জন্য আমরা এই বাড়তি সুবিধা পেয়ে থাকি। এয়ারপোর্টেই ডলার ভাঙ্গিয়ে টাকা নেপালের রুপিতে করে নিলাম। এখানে ভালো রেট পাওয়া যায়। তাছাড়া নেপালের টাকা থেকে বাংলা টাকার মান বেশি। তাই টাকা একটু বেশি আর মনটাও ভালো হয়ে গেল। বাংলাদেশে যে ৫ ঘন্টা এয়ারপোর্টে বসে ছিলাম তা আর মনেই ছিল না। এয়ারপোর্ট থেকে বেড়িয়ে ৫০০ রুপিতে একটা ট্যাক্সি ভাড়া করে থামেলে আমাদের হোটেলের পথে ছুটলাম। তবে একটা বিষয় সাবধান করি রাস্তায় কোনো দালালকে নিয়ে হোটেল খুজতে যাবেন না। এরা অবশ্য ভালো তবে কিছু কিছু লোক একটু অন্য রকম। কেন এই রকম তা আর ব্যাখ্যা করলাম না তাহলে অন্য দেশের উপর দোষ পড়ে যাবে। তবে নেপালে প্রচুর ইন্ডিয়ান দোকান আছে। যাক সেই কথায় পরে আসি। থামেলে এসেই আমরা হোটেলে নেমে লাগেজ রেখে খাওয়া দাওয়া করার জন্য আল মদিনা খাবার হোটেলে ঢুকলাম। থামেলে খাওয়া দাওয়ার জন্য ভাল জায়গা এই হোটেল। খাবার ভাল, দাম অনেক কম আর হালাল। নেপালে থাকে এমন বাংলাদেশীদের সাথেও দেখা হবে এই হোটেলে। নেপালিরা সবাই কমবেশি ভালো হিন্দি জানে। বাংলাও কিছু জানে । তবে আপনার হিন্দি জানা থাকলে ওদের সাথে কথা বলতে অসুবিধা হবে না । তারপরের দিন সকালে আমরা পোখরাতে যাব তাই তিনটা বাসের টিকেট কাটলাম দুপুরের খাওয়া দাওয়া সহ। আমি আবার আসার টিকেটটাও একসাথে কেটে নিলাম। ডিসেম্বর মাস ছিল সেখানে মোটামুটি ঠান্ডা ছিল। রাতের থামেল এলাকাটি ঘুড়ে দেখার জন্য বের হলাম। থামেল শহরটি তুলনা করলে আমাদের শাঁখারি বাজারের মতো। অসংখ্য হোটেল আছে – পুরোনো বাড়ীকে ভেঙ্গেচুড়ে হোটেলে রূপ দেওয়া তাই হোটেল ভাড়া তুলনামুলক কম। প্রচুর বিদেশি টুরিস্ট দেখতে পেলাম এখানে যা আমার ধারণার বাইরে ছিল। এই সব বিদেশি টুরিস্টরা অনায়েসেই এই সব হোটেলে দিব্যি রাত কাটিয়ে দিচ্ছে। অনেক দোকান পাট সাজিয়ে রেখেছে ট্যুরিস্টদের জন্য। এত বাহারি দোকানের পসরা আপনার দেখলেই মন চাইবে কিনতে কিন্তু সাবধান দর-দাম যাচাই বাছাই করে কিনবেন। না হলে ঠকবেন নিশ্চিত। বেশিরভাগ দোকানের পণ্য নকল অথবা রেপ্লিকা। অনেক রেস্টুরেন্ট, ক্যাফে ড্যান্সবার দেখতে পাবেন । সেই সাথে সেখান থেকে ভেসে আসা লাইভ মিউজিক আপনাকে বিমোহিত করবে। সবাই খুব সুশৃংখলভাবে এগুলো উপভোগ করে। আমি কোথাও কোনো রকম ঝামেলা দেখি নাই । তবে সেই সাথে একটা জিনিষ দেখেছি নেপালি ছেলে-মেয়েরা খুবই ফ্যাশন সচেতন এবং মার্জিত আচরণের অধিকারী। নেপালী ছেলেরা খুব সুন্দর করে চুল ছাঁটে। এই নেপাল শহরে অনেক কিছু দেখার আছে যা থামেলের আশে পাশেই । তবে সেসব জায়গায় আমি গিয়েছি তার নাম গুলো জানিয়ে দেই -গার্ডেন অব ড্রিমস, বৌদ্ধনাথ স্টুপা, সম্ভুনাথ মন্দির,মাংকি টেম্পল, পশুপথিনাহ মন্দির, দরবার স্কোয়ার। যার বর্ণনা আমি পরে দিব।
তবে থামেল আমার কাছে খুব ভালো লেগেছে- এর প্রধান কারণ যেহেতু আমি পুরাতন ঢাকার সাথে মিল আছে( শাঁখারি বাজার) আর আমি পুরাণ ঢাকার ছেলে তাই আমার কাছে জায়গাটি আপন লেগেছে। আরেকটা জিনিষ এখানে আপনি সব বর্ণের মানুষ পাবেন। নানান দেশের নানান খাবার পাবেন। এখানে ঘুরতে আপনার বোর ফিল হবে না । থামেলের কিছু রাস্তা ভিকেইল ফ্রি তাই আপনি হেঁটে অনেক মজা পাবেন। থামেলে দোকানপাট, রেস্টুরেন্ট ৯টায় বন্ধ হয়।
পরেরদিন সকাল ছয়টায় বাস। আমরা যাব পোখরাতে। যেতে ছয় থেকে আট ঘন্টা লাগে। তাই আমরা হোটেলে ফিরে আসলাম। হোটেল লাউঞ্জে কিছু ফরেনার বসে ছিল । আমি আজকের রাতের টাকা মিটানোর জন্য অপেক্ষা করছিলাম । ম্যানেজার আসলে তাকে ডলারে পেমেন্ট করে তিউনিশিয়ার দুজন ট্রাভেলারের সাথে কিছুক্ষণ গল্প করলাম এবং সাথে কিছু ফটোসেশন চলল। ভাবলাম সুদূর তিউনিশিয়া থকে এখানে এসেছে আমাদের বাংলাদেশে যদি এইভাবে পর্যটক আসত তাহলে অর্থনৈতিকভাবে আমরাও আরো কয়েক ধাপ এগিয়ে যেতে পারতাম। রাত বাড়ার সাথে সাথে ঠান্ডার প্রকোপ বাড়তে লাগল। আমরাও তাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে হোটেল রুমে ফিরে এসে আস্তে আস্তে কম্বলের নিচে ঢুকলাম। কিন্তু ঘুম ভালো হলো না। বারবার জেগে উঠলাম। দেখলাম ছেলে আর ছেলের মা ঘুমাচ্ছে। তবুও শুয়ে রইলাম পরেরদিন ভোরের আশায়। এই অচেনা দেশ অচেনা শহর কিন্তু আমার বিশ্বাস ছিল এখানকার মানুষ আপন হতে সময় নিবে না যা ভোরের আলো ফুটবার সাথে সাথে প্রমাণ পেয়েছি…… পরবর্তী লেখা পড়ার আমন্ত্রণ জানিয়ে বিদায় নিচ্ছি। শুভ সকাল-লেপাল, থামেল।









